Login Area

   
Not Member ? SignUP Now  
Forgot Password?

Course Two

পাঠ ২ গুনাহ্ আমাদেরকে খোদার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে

সমস্ত সমস্যার মধ্যেও আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন হলো প্রথমেই খোদাকে, কিন্তু পাঠ ২ অনুসারে দেখা যায় তা আমাদের জন্য বেশ কঠিন। কারণ গুনাহ্ আমাদেরকে খোদার দয়া ও সান্নিধ্যে এবং তাঁর সমস্ত রহমত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমরা এই পৃথিবীতে গুনাহ্রে মধ্যে এমনভাবে নিমজ্জিত, যার ফলে আমাদের রূহানিক জীবনের অবক্ষয় হচ্ছে।
খোদা আলো। তাঁর আলোর মধ্যে থেকে জীবন-যাপন করার পথে একমাত্র বাধা হলো গুনাহ্। আর এটাই হলো আমাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ। পবিত্র কোরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস উভয় কিতাব এই বিষয়ে আমাদেরকে স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়।
নবিদের কিতাব; ইশাইয় ৫৯ ঃ ২ আয়াত কিন্তু তোমাদের অন্যায় মাবুদের কাছ থেকে তোমাদের আলাদা করে দিয়েছে। তোমাদের গুনাহের দরুন তিনি তাঁর মুখ তোমাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন, সেজন্য তিনি শুনেন না।
আল-জবুর; ৬৬ রূকু ১৮ আয়াত আমার দিলে যদি আমি অন্যায় পুষে রাখতাম, তাহলে আমার কথা দ্বীন-দুনিয়ার মালিক শুনতেন না।
ইঞ্জিল শরীফ; ১ ইউহোন্না ১ ঃ ১০ আয়াত যদি বলি আমরা গুনাহ্ করিনি তবে আমরা তাঁকে (খোদাকে) মিথ্যাবাদী বানাই, আর তাঁর কালাম আমাদের অন্তরে নেই।
আল-কোরআন; সুরা বাকারা ৮১ আয়াত হাঁ, যারা পাপ কার্য করে এবং যাদের পাপরাশি তাহাদিগকে পরিবেষ্টন করে তারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
পবিত্র কোরআনের উপরোল্লিখিত আয়াতটির মাধ্যমে বুঝা যায়, “গুনাহ্ যে বেতন দেয় তা মৃত্যু” (ইঞ্জিল শরীফ; রোমীয় ৬ ঃ ২৩ আয়াত)। গুনাহ্রে দ্বারা আমরা যা লাভ করি তা হলো, শয়তানের দেয়া “বেতন”। সূরা বাকারা ৮১ আয়াত অনুসারেএকজন গুনাহ্গার তাঁর গুনাহ্ দ্বারা চতুর্দিকে বেষ্টিত থাকে। আর তাই সে চিরকালের জন্য দোজখে চলে যায়। কিন্তু আমরা জানি, খোদা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; যেন তারা তাঁর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রেখে সবসময় বেহেশতি আনন্দ উপভোগ করতে থাকে। কিন্তু মানুষ তাঁর ইচ্ছামত স্বাধীনভাবে চলতে গিয়ে খোদার অবাধ্য হতে থাকে। খোদার সাথে বিদ্রোহ বা নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় চলা এ সমস্ত বিষয়কে কিতাবুল মোকাদ্দস বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করেছে। যেমন গুনাহ্ করা,অবাধ্য হওয়া এবং খোদার আইন অমান্য করা ইত্যাদি।
তাছাড়াও খোদার দৃষ্টিতে সক্রিয় বিদ্রোহ এবং নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা এই উভয় পথের মধ্যে কোনটির কতটুকু গুরুত্ব? আপনি কি মনে করেন যে, নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতাও গুনাহ্ হিসেবে গণ্য করা হয়? সক্রিয় বিদ্রোহ এবং নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা এর মধ্যে আপনার দৃষ্টিতে কোনটি সাধারণ বলে মনে হয়? আপনি যদি একটু গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে বুঝতে পারবেন সত্যিকার অর্থে উভয়ই গুনাহ্। খোদা এবং শয়তানের সাথে সম্পর্কের মধ্যখানে কোন পথ নেই। আপনাকে যে কোন একটি পথ ধরে চলতে হবে।
গুনাহ্ শুধু আমাদের জন্য একটি দুঃসংবাদ তা নয়, ইহা একটি অত্যন্ত দুঃসংবাদ। কারণ, এই গুনাহ্ই আমাদেরকে খোদার কাছ থেকে পৃথক করে রাখে। আর পৃথক হবার ফলে আমরা ভীত, নৈরাশ্য, নিঃস্ব, দোষী, উদ্দেশ্যহীনতা, শান্তিহীনতা এবং নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করি। যখন আমরা সক্রিয়ভাবে গুনাহের পশ্চাতে পরিচালিত হই, তখন ধীরে ধীরে আমরা এতই বিপদগামী হয়ে পড়ি যে, নিজেরা নিজের অজান্তেই ধ্বংসাত্মক আচরণ করি। আমরা যদি চূড়ান্তভাবে খোদাকে অগ্রাহ্য করি; তখন আমরা নিজেরা নিজেদেরকে খোদার জায়গায় উপস্থাপন করি এবং যার ফলে আমরা নিজের ভালমন্দের বিচার নিজেরাই করে ফেলি।
অধিকাংশ মানুষ গুনাহ্রে বিষয়টাকে এড়িয়ে চলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই গুনাহ্কেই হৃদয়ে লালন করে রাখে। ফলে, সেসব লোক ধীরে ধীরে গুনাহ্রে অধীনে চলতে থাকে। আবার অনেক লোক আছে, তারা বিশ্বাস করতে চায় না যে, মানবজাতি আদৌ গুনাহ্গার। যদিও কখনও কখনও আমাদের বাহ্যিক আচার-আচারণে আমাদেরকে ভাল মানুষ সাজতে সাহায্যে করে। তাই বলে, আমরা যে গুনাহ্গার নই এ রকম সিদ্ধান্তে পৌছানো কতটুকু বাস্তব সম্মত?
পবিত্র কিতাব সমূহ এ বিষয়ে আমাদেরকে কি শিক্ষা দেয়, আসুন, তা আমরা আলোচনা করি ঃ
নবিদের কিতাব; ১ বাদশাহনামা ৮ ঃ ৪৬ আয়াত অবশ্য গুনাহ্ করে না এমন লোক নেই। ইহিস্কেল ১৮ ঃ ২০ আয়াত যে গুনাহ্ করবে সে-ই মরবে। হোশেয় ৮ ঃ ৭ আয়াত তারা তো বাতাস বুনে আর শেষে ঘূর্ণিঝড় কাটে।
আল-জবুর; ৫১ রুকু ৫ আয়াত দেখ, অপরাধে আমার জন্ম হয়েছে, গুনাহ্ েআমার মাতা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। ১৩০ রুকু ৩ আয়াত হে মাবুদ, তুমি যদি অন্যায়ের হিসাব রাখ, তবে হে মালিক, কে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। ১৪৩ রুকু ২ আয়াত তোমার এই সেবাকারীর বিচার করো না, কারণ তোমার চোখে কোন প্রাণীই নির্দোষ নয়।
ইঞ্জিল শরীফ; রোমীয় ৩ ঃ ১০ আয়াত ধার্মিক কেউ নেই, একজনও নেই। রোমীয় ৩ ঃ ২৩ আয়াত কারণ সবাই গুনাহ করেছে এবং খোদার প্রশংসা পাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গালাতীয় ৬ ঃ ৭ আয়াত তোমরা ভুল করো না, খোদার সংগে তামাশা চলে না, কারণ যে যা বুনবে সে তা-ই কাটবে। ১ ইইহোন্না ১ ঃ ৮ আয়াত যদি আমরা বলি আমাদের মধ্যে গুনাহ্ নেই তবে আমরা নিজেদের ফাঁকি দিই। তাতে এটাই বুঝা যায় যে, আমাদের অন্তরে খোদার সত্য নেই।
আল-কোরআন; সূরা যারিয়াত ৫৯-৬০ আয়াত যালিমদের প্রাপ্য তা-ই যা অতীতে উহাদের সমমতাবলম্বীরা ভোগ করেছে। সুতরাং উহারা ইহার জন্য আমার নিকট যেন ত্বরা না করে। কাফিরদের জন্য দুর্ভোগ তাদের সেই দিনের, যেই দিনের বিষয়ে উহাদিগকে সতর্ক করা হয়েছে।
সূরা আনকাবূত ৪০ আয়াত উহাদের প্রত্যেককেই আমি তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছি ঃ উহাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা; উহাদের কাকেও আঘাত করেছিলাম মহানাদ, কাকেও আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাকেও করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুলুম করেন নাই; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।
উপরোল্লেখিত পবিত্র কোরআনের আয়াত দু’টিতে গুনাহের ক্রমবৃদ্ধি ও তার বিচার সম্পর্কে অনেক কিছু বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা যারিয়াত ৫৯-৬০ আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, যারা মন্দ এবং খারাপ কাজ করে তারা শাস্তি পাবে। যদিও বা খোদা তাদেরকে শাস্তি দিবার জন্য তাড়াতাড়ি করেন না, কারণ এমন একটি ভয়ংকর দিন আসবে যখন তিনি তাদেরকে শাস্তি দিতে আরম্ভ করবেন। একইভাবে সূরা আনকাবূত ৪০ আয়াত অনুসারে বুঝা যায় যে, যারা গুনাহ্ েজীবন যাপন করে চলেছে তাদের গুনাহ্রে জন্য খোদার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
এই আয়াতগুলো দ্বারা আরো বুঝা যায় যে, খোদা কাউকে পাথর দ্বারা ও কাউকে মহামারী দ্বারা আঘাত করবেন। আবার কাউকে ভূ-গর্ভে নিক্ষেপ করবেন এবং কাউকে করবেন নিমজ্জিত। এখানে খোদা গুনাহ্ ও গুনাহ্গারদের বিষয়ে বলেছেন। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে, খোদা পবিত্র। তিনি এতই পবিত্র যে, গুনাহ্রে বিন্দুমাত্র তিনি সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু আমরা এই গুনাহ্পূর্ণ পৃথিবীতে বসবাস করতে গিয়ে যে গুনাহ্গার তা শুধু নয়, সেই আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) হতে আমরা গুনাহের মধ্যে দিয়ে বসবাস করে আসছি। কোন না কোন ভাবে আমরা গুনাহের সাথে জড়িত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু খোদার বিচারের সামনে যখন আমাদের প্রত্যেককে উপস্থিত হতে হবে, তখন তিনি ন্যায় বিচার করতে ভুল করবেন না এবং নিশ্চয়ই গুনাহ্রে শাস্তি দিবেন। আর যারা গুনাহের মধ্যে ডুবে আছে তার ফল যে শাস্তি তা তাদের অনিবার্য ভাবে বহন করতে হবে।
অনেকে মনে করে থাকে যে, গুনাহ্রে শাস্তি বলতে তেমন কিছু হবে না। একটি মন্দ কাজ করলে বা গুনাহ্ করলে, তার বিপরীতে যদি এর অধিক ভালকাজ বা ছওয়াবের কাজ করা যায় তাহলে ঐ গুনাহের জন্য কোন শাস্তি পেতে হবে না। সেরকম যারা মনে করে থাকে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ বলেছেন ঃ
আল-কোরআন; সূরা রুম ১০ আয়াত অতঃপর যারা মন্দ কর্ম করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ। সূরা বাকারা ৩০ আয়াত যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেস্তাদের বললেন, “আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করতেছি।” তারা বলল, “আপনি কি সেখানে এমন কাকেও সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে?”
এদোন উদ্যান অর্থাৎ বেহেশতের বাগান সৃষ্টির পূর্বে খোদা ফেরেস্তাগণকে বলেছেন যে, পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এমন একজনকে রাখতে যাচ্ছেন; যিনি হবেন মানুষ। ফেরেস্তাগণ তখন বললেন, “কি”? “কিন্তু মানুষ তার গুনাহের দরুন পৃথিবীকে ধ্বংস করবে।”
সূরা বাকারা ৩৬ আয়াত শয়তান উহা হতে তাদের [হযরত আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ)] পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল সেখান হতে তাহাদিগকে বহিস্কৃত করল। সূরা আ’রাফ ২২-২৩ আয়াত তাদের [হযরত আদম ও বিবি হাওয়া (আঃ)] প্রতিপালক তাহাদিগকে সম্বেবাধন করে বললেন, আমি কি তোমাদের এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হতে বারণ করি নি এবং আমি কি তোমাদিগকে বলিনি যে, শয়তান তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“? তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। যদি তুমি আমাদিগকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমার ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হব।
উপরোল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায় যে, এমন কোন ভাল কাজ নেই যা আমাদেরকে আমাদের গুনাহ্ থেকে উদ্ধার করতে পারে। তাঁরা বললেন, আমরা গুনাহ্গার এবং যদি খোদা আমাদের উদ্ধার না করতেন তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যেতাম। অনেক ধর্মীয় শিক্ষকেরা আদি গুনাহ্ সম্পর্কে বলেন না। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস আমাদেরকে সেই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন। কিতাব এ কথা বলে, আমরা শুধু এই পৃথিবীতে মন্দ কাজ করার মাধ্যমে গুনাহ্গার হই তা নয়, বরং হযরত আদম ও বিবি হাওয়া (আঃ) এর গুনাহ্ করার ফলে মানবজাতি রক্তের উত্তরাধিকারী সূত্রে তখন থেকে গুনাহ্ বহন করে আসছে।
আল-কোরআন; সূরা ত্বা-হা ১২১ আয়াত আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হল। সূরা ইব্রাহীম ৩৪ আয়াত মানুষ অবশ্যই অতিমাত্রাই যালিম, অকৃতজ্ঞ। সূরা আহযাব ৭২ আয়াত সে (মানুষ) তো অতিশয় যালিম, অতিশয় অজ্ঞ।
উপরোল্লেখিত তিনটি আয়াতের সাথে ইঞ্জিল শরীফের রোমীয় ৩ ঃ ২৩ আয়াতের মিল রয়েছে “কারণ সবাই গুনাহ্ করেছে এবং খোদার প্রশংসা পাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।”
আল-কোরআনে আরো উল্লেখ আছে যে, সূরা আল-ইমরান ১১ আয়াত আল্লাহ তাদের পাপের জন্য তাহাদিগকে শাস্তিদান করেছিলেন। আল্লাহ্ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর। সূরা ফাতির ১০ আয়াত যারা মন্দ কার্যের ফন্দি আঁটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি, তাদের ফন্দি ব্যর্থ হবেই। সূরা নাহ্ল ৩৪ আয়াত সুতরাং উহাদের উপর আপতিত হয়েছিল উহাদেরই মন্দ কর্মের শাস্তি এবং উহাদিগকে পরিবেষ্টন করেছিল তা-ই, যা লয়ে উহারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করত।
এই আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের গুনাহ্রে প্রতিফল তার নিজের প্রতিই ফিরে আসে। কেউ যদি কাউকে ফাঁদে ফেলতে চায়, তবে সে নিজেই তাতে পতিত হয়। নিজের গুনাহ্ নিজেকে খুঁজে বের করতে হবে। যখন আপনি আপনার গুনাহ্ আলোর সামনে নিয়ে আসবেন, তখন দেখতে পাবেন, একই গুনাহ্ বার বার করে যাচ্ছেন।
আল-কোরআন; সূরা জাছিয়া ৭-৮ আয়াত দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াত সমূহের তিলাওয়াত শুনে অথচ ঔদ্ধ্যত্যের সাথে অটল থাকে (গুনাহ্রে মধ্যে) যেন সে উহা শুনে নাই। সূরা বাকারা ২৭৬ আয়াত আল্লাহ্ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসে না।
যদি আমরা উপরোল্লেখিত আয়াতগুলো নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে বুঝা যায় যে, গুনাহ্ হলো একটি বাস্তবতা। ইহাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। গুনাহ্ যে পৃথিবীতে বিরাজমান এ সত্যকে মেনে নিয়ে আমাদেরকে এর শাস্তি থেকে উদ্ধার পাবার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। অনেক সময় আমরা বাহ্যিক ব্যাপার গুলোকে গুনাহ্ হিসেবে গণ্য করি এবং এর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই। কিন্তু আমরা জানি, বাহ্যিক মন্দতার চেয়েও আমাদের হৃদয়কে পবিত্র রাখা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে পবিত্র ইঞ্জিল শরীফ; মথি ২৩ ঃ ২৫-২৮ আয়াতে হযরত ঈসা মসিহ্ বলেছেন, “ভন্ড আলেম ও ফরীশীরা, ঘৃণ্য আপনারা! আপনারা থালা-পেয়ালার বাইরের দিকটা পরিষ্কার করে থাকেন, কিন্তু সেগুলো জুলুমের জিনিষ আর লোভের ফল দিয়ে পূর্ণ। অন্ধ ফরীশীরা, আগে সেগুলোর ভিতরের দিকটা পরিষ্কার করুন, তাতে তাঁর বাইরের দিকটাও পরিষ্কার হবে। ভন্ড আলেম ও ফরীশীরা, ঘৃণ্য আপনারা! আপনারা চুনকাম করা কবরের মত, যার বাইরের দিকটা সুন্দর কিন্তু ভিতরটা মরা মানুষের হাড় গোড় ও সব রকম ময়লায় ভরা। ঠিক সেইভাবে, বাইরে আপনারা লোকদের চোখে ধার্মিক কিন্তু ভিতরে ভণ্ডামি ও গুনাহ্পেূর্ণ।”
তাই যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি তার হৃদয়ের গুনাহ্কে দেখতে না পায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেইব্যক্তি সত্যিকার অর্থে গুনাহ্ সম্পর্কে বুঝতে পারবে না। যখন একজন গুনাহ্ সম্পর্কে সঠিক ভাবে না বুঝে তাহলে এর থেকে নাজাত লাভের প্রয়োজনীয়তাও সে উপলব্ধি করতে পারবে না। লক্ষ্য করুন, আপনাকে যদি এখন প্রশ্ন করা হয় যে, আপনি কি একজন গুনাহ্গার? হয়ত আপনি নিজের হৃদয়েই তা মেনে নিতে প্রস্তুত যে, খোদার দৃষ্টিতে আপনি একজন গুনাহ্গার। যদি আপনি সত্যিই মনে করে থাকেন যে, আপনি একজন গুনাহ্গার, তাহলে এই গুনাহকে কি আপনি নিজেই ভাল কাজ দিয়ে বা অন্য যে কোনভাবে হোক তা থেকে মুক্ত হতে পারবেন?
পাঠ ৩ এ আমরা সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এরপূর্বে এই পাঠের সাথে সংযুক্ত প্রশ্নপত্রটি পূরণ করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আপনি ইতিমধ্যে ২টি পাঠ শেষ করেছেন, সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। খোদা আপনাকে রহমত দান করুন। আমেন।
পাঠ ১ আমাদের জীবনের জন্য খোদার উদ্দেশ্য

খোদা প্রেমময়। তিনি এমন কাউকে ভালবাসতে চান, যে তাঁর ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারবে। গাছপালা ও জীবজন্তু তাঁকে ভালবাসতে পারে না। তিনি এমন কাউকে ভালবাসতে চান, যে তাঁর ভালবাসাকে মূল্যায়ন করবে এবং তা অন্যের জীবনকেও অর্থবহ করে তুলবে। আর তাই তিনি শ্রেষ্ঠজীব হিসেবে তাঁর মত করে মানুষ সৃষ্টি করলেন।
আল-কোরআন; সূরা বাকারা ৩০-৩৯ এবং সূরা আ’রাফ ১৮-২৫ আয়াত এবং আল-তৌরাত; পয়দায়েশ ১ ঃ ২৪ আয়াত অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই, খোদা মানুষকে পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। এমনকি ফেরেশতাগণ থেকেও অধিক জ্ঞান দান করেছিলেন। খোদা হযরত আদমের জন্য একজন নারীও সৃষ্টি করেছিলেন, যাঁর নাম দিয়েছিলেন হযরত হাওয়া।
কিতাব থেকে আমরা আরো জানতে পারি যে, খোদা তাঁদের উভয়কে বেহেশতের বাগানে রেখেছিলেন এবং স্বাচ্ছন্দে সেখানে বসবাস ও সমস্ত কিছু আহার করার অনুমতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ খোদার কতটুকু বাধ্যতায় জীবন-যাপন করে তা দেখার জন্য তিনি তাঁদেরকে, বাগানের হাজারো গাছের মধ্য থেকে একটি মাত্র গাছের ফল খেতে নিষেধ করে দিলেন। সাথে সাথে এ সাবধানবাণীও জানিয়ে দিয়েছিলেন, যদি তাঁরা এ আদেশ অমান্য করে তাহলে তাঁরা যালিমদের অর্ন্তভূক্ত হবে অর্থাৎ খোদার সাথে তাঁদের সুন্দর সম্পর্কের মৃত্যু ঘটবে অর্থাৎ তাঁর সাথে দূরত্ব বেড়ে যাবে।
এর পরের ঘটনা আমরা সবাই জানি। হযরত আদম (আঃ) এবং তাঁর স্ত্রী খোদার দেয়া একটি মাত্র আদেশ পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁরা উভয়েই শয়তানের পাতানো ফাঁদে পড়ে বেহেস্তর বাগান থেকে বিতাড়িত হলেন। এভাবেই মানবজাতি গুনাহ্রে জগতে প্রবেশ করলেন। আর সেই থেকে গুনাহ্ আমাদেরকে খোদার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। যেহেতু, খোদা প্রেমময়, সেহেতু, তিনি এই গুনাহ্ থেকে মানবজাতিকে উদ্ধার করতে ওয়াদাবদ্ধ হলেন।
আল-তৌরাত; পয়দায়েশ ৩ ঃ ১৫ আয়াত আমি তোমার (শয়তান) ও স্ত্রীলোকের মধ্যে এবং তোমার বংশ ও স্ত্রীলোকের মধ্য দিয়ে আসা বংশের মধ্যে শত্র“তা সৃষ্টি করব। সেই বংশের একজন তোমার মাথা পিষে দিবে আর তুমি তার পায়ের গোড়ালিতে ছোবল মারবে।
আল-কোরআন; সূরা বাকারা ৩৮ আয়াত ... যখন আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোন ভয় নাই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
সূরা আ’রাফ ২৪ - ২৫ আয়াত ... তোমরা একে অন্যের শত্র“ এবং পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রহিল, সেখানেই তোমরা জীবন যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে এবং তথা হতেই তোমাদিগকে বের করে আনা হবে।
উপরোল্লোখিত আয়াতসমূহ থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, খোদা আমাদেরকে শয়তানের কবল থেকে অর্থাৎ গুনাহ্ থেকে উদ্ধার করে পুনরায় স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সৎপথের এক নির্দেশ বা পরিচালনা পাঠাবেন বলে ওয়াদাবদ্ধ। আল-তৌরাতে উল্লেখ আছে, তিনি এমন এক নির্দেশক পাঠাবেন যিনি স্ত্রীলোকের গর্ভ হতে আগমন করবেন। আর তাঁর এই নির্দেশিত পথ যারা অনুসরণ করবে, পরকালে তাদের আর কোন ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
আল-তৌরাত; দ্বিতীয় বিবরণ ৭ ঃ ৯ আয়াত কাজেই তোমরা জেনে রেখো যে, তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্ই মাবুদ। তিনি বিশ্বস্ত; যারা তাঁকে মহব্বত করে ও তাঁর হুকুমগুলো পালন করে তাদের জন্য তিনি যে ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন তা তিনি হাজার হাজার পুরুষ পর্যন্ত রক্ষা করেন এবং তাদের প্রতি তাঁর অটল মহব্বত দেখান।
আল-জবুর; ৫ রূকু ১২ আয়াত হে মাবুদ, যারা তোমার ভক্ত তাদের উপর সত্যিই তোমার দোয়া রয়েছে, তোমার রহমত দিয়ে তুমি তাদের ঢালের মত করে ঘিরে রেখেছ।
ইঞ্জির শরীফ; লুক ১ ঃ ৫০ আয়াত যারা তাঁকে ভয় করে তাদের প্রতি তিনি মমতা করেন, বংশের পর বংশ ধরেই করেন।
আল-কোরআন; সূরা আ’রাফ ৯৬ আয়াত যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনিত ও তাকওয়া অবলম্বন করিত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উম্মুক্ত করতাম ....।
উপরোল্লোখিত কিতাবের আয়াত সমূহের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, খোদা তাঁর সৃষ্ট মানবজাতির প্রতি অতীব যতশীল। তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন নবি ও রসুলগণের মাধ্যমে আমাদের জন্য তাঁর আকাংখার কথা প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর আকাংখা, যেন আমরা তাঁর কাছ থেকে সত্যিকারের শান্তি, আনন্দ, নিরাপত্তা ও পরিচালনা লাভ করতে পারি। আর এ সমস্ত একমাত্র তাঁর সাথে ঘনিষ্ট রূহানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে লাভ করা যায়।
আমরা জানি, একটি পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক বাল্ব, যাতে অনেক ময়লা জমে আছে, তা যদি বৈদ্যুতিক লাইনের সাথে সংযোগ দেয়া হয় তাহলে সেই বাল্বটি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং তা পূর্বের ন্যায় আলোকিত করতে পারবে না। কিন্তু একটি নতুন বা পরিষ্কার বাল্বের আলো উজ্জ্বল ও প্রাণন্ত হয়ে ওঠে এবং সেই বাল্বটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে অন্যকে পথ চলতে সাহায্য করে। এটা একটি উপমা মাত্র যা থেকে আমরা বুঝতে পারি, খোদাকে জানার পূর্বে এবং জানার পরে তাঁর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ হলে আমাদের অবস্থান কি রকম হয়। এখানে পবিত্র কোরআন ও কিতাবুল মোকাদ্দস থেকে একই বিষয়ে কিছু আয়াত উল্লেখ করা হলোঃ
নবিদের কিতাব; ইশাইয় ৬০ ঃ ২০ আয়াত মাবুদই হবেন তোমার চিরস্থায়ী আলো;
আল-জবুর; ১৬ রূকু ১১ আয়াত জীবনের পথ তুমি আমাকে শিখিয়েছ; তোমার দরবারে থাকায় আছে পরিপূর্ণ আনন্দ, আর তোমার ডান পাশে রয়েছে চিরকালের সুখ। ২৭ রূকু ১ আয়াত মাবুদই আমার নূর ও আমার উদ্ধারকর্তা, আমি কাকে ভয় করব? মাবুদই আমার জীবনের কেল্লা, আমি কাকে দেখে ভয়ে কাঁপব?
ইঞ্জিল শরীফ; ১ পিতর ২ ঃ ৯ আয়াত কিন্তু তোমরা তো বাছাই করা বংশ হয়েছ; তোমাদের দিয়ে গড়া হয়েছে ইমামদের রাজ্য; তোমরা পবিত্র জাতি ও তাঁর নিজের বান্দা হয়েছ; যেন অন্ধকার থেকে যিনি তোমাদের তাঁর আশ্চর্য নূরের মধ্যে ডেকে এনেছেন তোমরা তাঁরই গুণগান কর। আল-কোরআন; সুরা নূর ৩৫ আয়াত আল্লাহ্ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর জ্যোতি, তাঁর জ্যোতির উপমা যেন একটি দীপাধার যার মধ্যে আছে এক প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচের আবরণের মধ্যে স্থাপিত, কাঁচের আবরণটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ; ইহা প্রজ্বলিত করা হয় পূত-পবিত্র যায়াতূন বৃক্ষের তৈল দ্বারা যা প্রাচ্যের নয়, প্রতীচ্যেরও নয়, অগ্নি উহাকে স্পর্শ না করলেও যেন উহার তেল উজ্জ্বল আলো দিতেছে; জ্যোতির উপর জ্যোতি! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে।
সুতরাং, আমরা বুঝতে পারছি যে, আমাদের জীবনের জন্য খোদার একটা ইচ্ছা বা আকাংখা আছে। আর তা হলো - আমরা যেন খোদার সান্নিধ্যে অবস্থান করি। আমরা যেন পুনরায় খোদার সাথে বেহেস্তে বসবাস করি। সত্যিই, তিনি আমাদের মহব্বত করেন। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের গুনাহ্পূর্ণ জীবন আমাদেরকে খোদার সেই মহব্বত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
এর পরের পাঠে আমরা দেখব, কিভাবে “গুনাহ্ আমাদেরকে খোদার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।” তার আগে এই পাঠটি ভাল করে পড়ে সাথে সংযুক্ত প্রশ্নপত্রটি পূরণ করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন।
খোদা আপনাকে তাঁর কালাম বুঝবার তৌফিক দান করুন। আমেন।

 Start Exam